২৬ মার্চ: বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস
ভূমিকা
২৬ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, যা দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে। এই দিনটি বাংলাদেশের জনগণের জন্য স্বাধীনতার প্রতীক, আত্মত্যাগের স্মারক এবং একটি জাতির আত্মপরিচয়ের অভিব্যক্তি।
পটভূমি
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হওয়ার পর পাকিস্তান নামে একটি নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়, যার দুটি অংশ ছিল – পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) এবং পশ্চিম পাকিস্তান (বর্তমান পাকিস্তান)। কিন্তু ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক দিক থেকে ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ অবিচারের শিকার হতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে শোষণ করতে থাকে।
ভাষা আন্দোলন ও স্বাধিকারের পথ
১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। এর বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ প্রতিবাদ শুরু করে, যা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে রূপ নেয়। শহীদদের রক্তে রাঙানো ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়, যা পরবর্তীতে জাতিসংঘের স্বীকৃতি লাভ করে এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়।
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলেও, পাকিস্তানি শাসকরা ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখে। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা করেন, যা পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানায়। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়।
১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চ
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, যেখানে তিনি বলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এই ভাষণ বাঙালির মুক্তির সনদ হয়ে ওঠে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক গণহত্যা অভিযান শুরু করে, যেখানে হাজার হাজার নিরপরাধ বাঙালি নিহত হয়। সেই রাতেই বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির এই মহান নেতা গ্রেপ্তার হন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে।
অপারেশন সার্চলাইট
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে একটি পরিকল্পিত গণহত্যা চালায়, যার মাধ্যমে তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে নির্মূল করতে চেয়েছিল। এ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান শহরগুলো দখল করা এবং রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধীদের দমন করা। এই গণহত্যা ১৯৭০ সালের ‘অপারেশন ব্লিটজ’ এর ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সংগ্রাম
২৬ মার্চের পর সারা দেশে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনী এবং সাধারণ জনগণ রুখে দাঁড়ায়। নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন এবং দুই লাখেরও বেশি নারী নির্যাতনের শিকার হন।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
২৬ মার্চের তাৎপর্য
১. জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক: ২৬ মার্চ আমাদের জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক, যা আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামের গৌরবময় অধ্যায়কে স্মরণ করিয়ে দেয়।
২. আত্মত্যাগের স্বীকৃতি: এ দিনটি আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ও সাধারণ জনগণের সাহসী ভূমিকার স্বীকৃতি প্রদান করে।
৩. প্রেরণার উৎস: এই দিনটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস, যা জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেম জাগ্রত করে।
স্বাধীনতার ঘোষণা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ মার্চ রাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর করেন, যা চট্টগ্রামের ই.পি.আর. ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে প্রচারের জন্য পাঠানো হয়।
স্বাধীনতা দিবস উদযাপন
বাংলাদেশে স্বাধীনতা দিবস অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করা হয়। জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির শুভ সূচনা করা হয়। সরকারি ও বেসরকারি ভবনগুলোতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং শহরগুলোকে বিভিন্ন রঙের পতাকায় সাজানো হয়। জাতীয় স্টেডিয়ামে শিক্ষার্থীদের কুচকাওয়াজ, ডিসপ্লে ও শারীরিক কসরত প্রদর্শিত হয়। এছাড়া, পত্রিকাগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে এবং বেতার ও টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী
২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হয়। বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের ভেতরে ও বাইরে এ দিবসটি স্মরণ করা হয়।
স্বাধীনতা পুরস্কার
বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৭ সাল থেকে জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে। এটি দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা।
উপসংহার
২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি কেবল একটি দিন নয়, বরং একটি চেতনা, একটি সংগ্রামের ইতিহাস। এই দিনটির তাৎপর্য হৃদয়ে ধারণ করে আমাদের উচিত দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে কাজ করা, যেন আমরা সত্যিকার অর্থে স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারি।