মায়ের দুধ না হলে করণীয়:
মায়ের দুধ নবজাতকের জন্য সেরা খাদ্য। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে মা পর্যাপ্ত পরিমাণে দুধ উৎপাদন করতে না পারলে বা বিশেষ কোনো কারণে স্তন্যপান করানো সম্ভব না হলে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়। এই পরিস্থিতিতে নবজাতকের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে কিছু ধাপ অনুসরণ করা যেতে পারে।
১. দুধ বৃদ্ধির চেষ্টা করুন:
অনেক সময় কিছু পদক্ষেপ নিলে মায়ের দুধের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে:
- বারবার স্তন্যপান করান: নবজাতক যত বেশি চুষবে, তত বেশি দুধ উৎপাদিত হয়।
- সঠিক অবস্থানে স্তন্যপান করানো: শিশুকে সঠিক অবস্থানে রেখে স্তন্যপান করালে দুধ বের হতে সুবিধা হয়।
- পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত পানি: মায়ের খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবার, দুধ, ফলমূল ও পর্যাপ্ত পানি রাখুন।
- বিশ্রাম ও মানসিক প্রশান্তি: মানসিক চাপ কমানো এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
- দাই বা স্তন্যপান পরামর্শকের সাহায্য নিন: প্রশিক্ষিত ব্যক্তির সহায়তা নিলে অনেক সময় সমস্যা সমাধান করা যায়।
২. বিকল্প খাবার:
যদি মায়ের দুধ না হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শে নবজাতকের জন্য নিম্নলিখিত বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে:
- শিশু ফর্মুলা দুধ: এটি মায়ের দুধের বিকল্প হিসেবে নিরাপদ এবং পুষ্টিকর। শিশুর বয়স ও ওজন অনুযায়ী সঠিক ফর্মুলা নির্বাচন করতে হবে।
- দানাদার দুধ নয়: গরুর দুধ বা অন্য কোনো দুধ সরাসরি নবজাতকের জন্য উপযুক্ত নয়, কারণ এটি হজমে সমস্যা করতে পারে এবং পর্যাপ্ত পুষ্টি দেয় না।
৩. দাতা স্তন্যদাত্রী (Wet Nurse):
কখনও কখনও দাতা মায়ের দুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। বিভিন্ন দেশে দুধ ব্যাংকের মাধ্যমে এই সুবিধা পাওয়া যায়। তবে দাতা মায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরি।
৪. চিকিৎসকের পরামর্শ:
মায়ের দুধ না হলে অবশ্যই শিশু বিশেষজ্ঞ বা স্তন্যপান পরামর্শকের পরামর্শ নিন। শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে তাদের গাইডলাইন মেনে চলুন।
নবজাতকের সুস্থতা ও বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
মায়ের বুকের দুধ বাড়ানোর ঘরোয়া উপায়:
বেশিরভাগ মা সন্তানের জন্মের পর স্বাভাবিকভাবেই পর্যাপ্ত পরিমাণে দুধ উৎপাদন করতে পারেন। তবে কখনো কখনো দুধ কম হলে তা বাড়ানোর জন্য কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে।
১. বারবার স্তন্যপান করানো:
- নবজাতক যত বেশি স্তন্যপান করবে, তত বেশি দুধ উৎপাদন হবে।
- শিশুকে দুই থেকে তিন ঘণ্টা অন্তর স্তন্যপান করান।
২. সঠিক অবস্থান ও ল্যাচিং:
- শিশুর মুখ সঠিকভাবে স্তনগ্রন্থির উপর রাখতে হবে, যাতে সে সহজে দুধ চুষতে পারে।
- সঠিকভাবে ল্যাচ না করলে শিশুর দুধ পান করা কঠিন হতে পারে এবং দুধের পরিমাণ কমে যেতে পারে।
৩. পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ:
- মায়ের খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবার থাকতে হবে।
- বেশি করে শাকসবজি, মাছ, ডাল, ফলমূল ও দুধ খান।
- খেজুর, কালোজিরা, সরিষা, মিষ্টি আলু, মেথি, এবং রসুন দুধ বৃদ্ধিতে সহায়ক।
৪. পর্যাপ্ত পানি পান:
- প্রতিদিন ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন।
- স্তন্যপান করানোর পর বা আগে গরম পানি বা তরল খাবার খান।
৫. বিশ্রাম ও মানসিক প্রশান্তি:
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং ঘুম দুধ উৎপাদনে সহায়ক।
- মানসিক চাপ কমানোর জন্য মেডিটেশন বা শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যায়াম করুন।
৬. গরম সেঁক:
- স্তনের উপর গরম কাপড় বা তোয়ালে দিয়ে হালকা সেঁক দিন।
- এটি স্তনগ্রন্থি খুলে দেয় এবং দুধ প্রবাহ বাড়াতে সাহায্য করে।
৭. গালাক্টোগগস (Galactagogues) বা দুধ বৃদ্ধিকারী খাবার:
- মেথি: প্রতিদিন এক চামচ মেথি চা বা ভেজানো পানি পান করুন।
- কালোজিরা: সামান্য পরিমাণ কালোজিরা গুঁড়ো খেতে পারেন।
- রসুন: প্রতিদিন ২-৩ কোয়া রসুন খেলে দুধ বাড়ে।
- খেজুর: পুষ্টিকর এবং শক্তি বাড়াতে সহায়ক।
৮. শিশুর ত্বকের সংস্পর্শ:
- শিশু মায়ের ত্বকের সংস্পর্শে এলে অক্সিটোসিন হরমোন বৃদ্ধি পায়, যা দুধ বাড়াতে সাহায্য করে।
৯. ধৈর্য ধরুন ও ইতিবাচক থাকুন:
- বুকের দুধ বৃদ্ধি সময় সাপেক্ষ, তাই ধৈর্য ধরুন এবং আশাবাদী থাকুন।
যদি দুধ একেবারে কম হয় বা না আসে:
- দ্রুত একজন স্তন্যপান পরামর্শক বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- শিশুর জন্য প্রয়োজনে ফর্মুলা দুধ ব্যবহার করুন।
সঠিক যত্ন ও নিয়মিত প্রচেষ্টায় বুকের দুধ বৃদ্ধি করা সম্ভব।
বুকের দুধ জমে গেলে করণীয় (Engorgement Management):
বুকের দুধ জমে গেলে স্তন ফুলে ওঠে, ব্যথা হয় এবং কখনো শক্ত হয়ে যায়। এটি মায়ের জন্য অস্বস্তিকর এবং শিশুর স্তন্যপান করাও কঠিন হতে পারে। তবে সঠিক ব্যবস্থা নিলে সহজেই এই সমস্যা সমাধান করা যায়।
কারণ:
- নবজাতক পর্যাপ্ত পরিমাণে বা সঠিকভাবে স্তন্যপান না করলে।
- স্তন্যপান বিরতি দিয়ে করালে।
- বুকের দুধ পুরোপুরি খালি না হলে।
- স্তন্যপান শুরুর পর প্রথম কয়েকদিন বেশি দুধ উৎপাদিত হলে।
দুধ জমে গেলে করণীয়:
১. বারবার স্তন্যপান করান:
- নবজাতককে বারবার এবং সঠিকভাবে স্তন্যপান করান।
- দুই থেকে তিন ঘণ্টা অন্তর শিশুকে স্তন্যপান করান, এমনকি রাতেও।
- শিশুর মুখ সঠিকভাবে স্তনের উপর রাখুন যাতে দুধ সহজে বের হয়।
২. স্তনের ম্যাসাজ করুন:
- স্তন্যপান করানোর আগে ও পরে আলতোভাবে স্তন ম্যাসাজ করুন।
- আঙ্গুলের সাহায্যে বৃত্তাকারভাবে ম্যাসাজ করুন, যাতে দুধ জমে না থাকে।
৩. গরম ও ঠান্ডা সেঁক:
- স্তন্যপানের আগে গরম সেঁক দিন: গরম তোয়ালে বা কাপড় দিয়ে স্তনে হালকা সেঁক দিলে দুধ নরম হয় এবং সহজে বের হয়।
- স্তন্যপানের পরে ঠান্ডা সেঁক দিন: ব্যথা ও ফোলাভাব কমাতে ঠান্ডা তোয়ালে বা আইস প্যাক ব্যবহার করুন।
৪. হাত বা পাম্প দিয়ে দুধ বের করুন:
- শিশুকে স্তন্যপান করানোর পরও যদি স্তনে দুধ জমে থাকে, তবে হাত বা ব্রেস্ট পাম্প দিয়ে অতিরিক্ত দুধ বের করে ফেলুন।
- এতে স্তন নরম হবে এবং দুধ জমে থাকার সমস্যা কমবে।
৫. সঠিক স্তন্যপান পজিশন (Position):
- বিভিন্ন পজিশনে শিশুকে স্তন্যপান করান।
- কখনো সোজা বসে, কখনো বা কাত হয়ে শুয়ে শিশুকে খাওয়ান।
৬. বিশ্রাম ও আরাম:
- প্রচুর বিশ্রাম নিন এবং শারীরিকভাবে আরামদায়ক অবস্থানে থাকুন।
- ব্যথা বেশি হলে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ নিতে পারেন (চিকিৎসকের পরামর্শে)।
সতর্কতা:
- যদি স্তনে লালচে ভাব, প্রচণ্ড ব্যথা বা জ্বর আসে, তবে এটি স্তন প্রদাহ (Mastitis) হতে পারে।
- দ্রুত একজন স্তন্যপান পরামর্শক বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা:
- শিশুর চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত স্তন্যপান করান।
- অতিরিক্ত দুধ পাম্প বা হাত দিয়ে বের করে ফেলুন।
- স্তন্যপানের আগে এবং পরে স্তনের যত্ন নিন।
দুধ জমে যাওয়া স্বাভাবিক এবং এর দ্রুত সমাধান করা সম্ভব। সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে মা এবং শিশুর জন্য এটি কোনো বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় না।